ই-পেপার | বুধবার , ১৭ই জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

কীসের এত দুঃখ তারাদের?

বিনোদন ডেস্ক:

রুপালি পর্দায় আলো ঝলমলে জীবন তাদের। খুব সাধারণভাবেই অধিকাংশ মানুষের ধারণা তারকারা সুখী ও সফল। অথচ তাদের জীবনে না পাওয়া, বেদনা কিংবা হতাশা অন্য সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশিই! কিংবদন্তি রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী সাদি মহম্মদের আত্মহননের পর সেই আলোচনা আরো জোরালো করলো। আরেক বার প্রশ্নটা সামনে এলো ‘তারকাদের এতো অপমৃত্যু কেন?’

 

বেশিরভাগ আত্মহত্যাই হতাশা ও পাওয়া না পাওয়ার হিসেব-নিকেশ থেকে হয়ে থাকে। কী আছে, কী নেই, সেই দোলাচলে মন পড়ে যায় বিপাকে। পারিবারিক দূরত্ব, সাংসারিক বোঝাপড়া, বন্ধু এমনকি সহকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো না হলে একটা পর্যায়ে গিয়ে হতাশায় ডুবে যান অনেকে। সাংসারিক টানাপড়েন, কাজ কমে যাওয়া, সাফল্য না পাওয়া কিংবা প্রেম সংক্রান্ত নানাবিধ কারণে কমবেশি হতাশা দেখা যায় তাদের মধ্যেও। এসব প্রভাবিত করে আত্মহত্যার দিকে। তবে এর বাইরেও আরো অনেক কারণ থাকতে পারে।

দেশে এত তারকার অপমৃত্যু

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেত্রী ডলি আনোয়ার ১৯৯১ সালের ৩ জুলাই আত্মহত্যা করেন। স্বামী আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে তালাকের আঘাত সইতে না পেরে তিনি আত্মহননের পথ বেছে নেন বলে জানা যায়। পারিবারিক অশান্তির কারণেই আত্মহত্যা করেছিলেন ছোটপর্দার অভিনেত্রী নায়ার সুলতানা লোপা। ২০১৪ সালের গুলশানের নিজ বাসা থেকে তার ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

 

নব্বই দশকে টিভির মিষ্টিমুখ মিতা নূরের জীবনে কী এমন ঘটলো যে হুট করে তিনি আত্মহত্যা করে বসলেন! ২০১৩ সালের ১ জুলাই আত্মহত্যার পর তার বাবার মারফত জানা যায়, স্বামীর সঙ্গে অনেকদিন ধরেই বনিবনা হচ্ছিলো না মিতার। ২০১১ সালে আত্মহত্যা করেন অভিনেত্রী ও মডেল ও লাক্স-তারকা সুমাইয়া আজগার রাহার। চিত্রনায়ক অনন্ত জলিলকে জড়িয়ে রাহার মৃত্যু নিয়ে গুঞ্জন ওঠে। তবে এই গুঞ্জনকে উড়িয়ে দেয় তার পরিবার। এছাড়া ২০১৭ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে পারিবারিক কলহের কারণে আত্মহত্যা করেন মডেল জ্যাকুলিন মিথিলা।

 

তবে কিছু কিছু আত্মহত্যার কারণ এখনো রহস্যই রয়ে গেল! এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ঢাকাই সিনেমার ক্ষণজন্মা নায়ক সালমান শাহ। ক্যারিয়ারের জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকার সময় হঠাত্ই ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রহস্যজনকভাবে মৃত্যু হয় তার। হত্যা নাকি আত্মহত্যা এর কোনো আইনি সুরাহা শেষ পর্যন্ত হয়নি। সর্বশেষ গত বছরের ২ নভেম্বর আত্মহননের পথ বেছে নেন ছোটপর্দার জনপ্রিয় অভিনেত্রী হুমায়রা হিমু। তার মৃত্যু নিয়েও তৈরি হয়েছে রহস্য।

বিশ্বব্যাপী তালিকাও বেশ দীর্ঘ

দেশ পেরিয়ে বিভিন্ন দেশের তারকারাও একই ধরনের কারণে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়ে ইচ্ছামৃত্যুর স্বাদ মিটিয়েছেন। এর মধ্যে অন্যতম বলিউড তারকা দিব্যা ভারতী, অভিনেত্রী জিয়া খান, ভিভেকা বাবাজি, দক্ষিণ ভারতের অভিনেত্রী সিল্ক স্মিতা, জনপ্রিয় মডেল ও টিভি তারকা কুলজিত্ রানধাওয়া, জনপ্রিয় টিভি তারকা ও উপস্থাপিকা নাফিসা জোসেফ, জনপ্রিয় অভিনেতা ও পরিচালক গুরু দত্ত, সুশান্ত সিং রাজপুত।

এছাড়া হলিউড সুপারস্টার মেরিলিন মনরো, লুসি গর্ডন, মার্কিন কমেডিয়ান রবিন উইলিয়ামস, অভিনেত্রী দপেগ এন্টউইসটলদ, জনপ্রিয় লেখক ও প্রযোজক স্টিভ বিং, অভিনেত্রী নায়া রিভেরা তো রয়েছেনই। বিশ্ব সংগীতে সবচেয়ে বড় দুই উদাহরণ নির্ভানা ব্যান্ডের ভোকালিস্ট কার্ট কোবাইন ও ‘লিংকিন পার্ক’ ব্যান্ডের গায়ক চেস্টার বেনিংটন।

 

আত্মহত্যা ও মানসিক অবসাদ নিয়ে আলোচনা

বিভিন্ন সময় আত্মহত্যা ও মানসিক অবসাদ নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেছেন বলিউড ও হলিউডের জনপ্রিয় তারকারা। এ তালিকায় রয়েছেন— দীপিকা পাড়ুকোন, শাহরুখ খান, অমিতাভ বচ্চন, এআর রহমান, ডোয়েন জনসন, লেডি গাগা, বিয়ান্সে, অ্যাডেল, মাইলি সাইরাস’সহ অনেকেই। এসব তারকারা মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নিতে জোর দিয়েছেন।

বলিউড অভিনেত্রী দীপিকা পাডুকোন বলেন, ‘এক এক সময় আত্মহত্যার কথাও মাথায় আসত। শারীরিক বা মানসিকভাবে কিছুই যেন অনুভব করতে পারছিলাম না। ভেতরটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল। যার এই অনুভূতি হয়নি তাকে বুঝিয়ে বলাটা কঠিন পুরো বিষয়টা।’ এছাড়া ম্রুণাল ঠাকুর, আমিত সাধের মতো একাধিক তারকারাও আত্মহত্যার প্রবণতার কথা জানিয়েছেন। অন্যদিকে অমিতাভ বচ্চন, শাহরুখ খানের মতো একাধিক বিখ্যাত বলিউড তারকারা তাদের জীবনযুদ্ধের কথা বলতে গিয়ে হতাশা, অবসাদের বিষয়টি বিভিন্ন সময়ে উল্লেখ করেছেন।

 

কেন এই অবসাদ

শোবিজ তারকাদের অবসাদের বা অন্যান্য মানসিক রোগের সঙ্গে লড়াই নতুন নয়। এ বিষয়ে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ড. শর্মিলা সরকার বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘অভিনেতা-অভিনেত্রী, গায়ক বা বিনোদন দুনিয়ায় যারা আছেন, তাদের প্রতিনিয়ত প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হতে হয়। চড়াই উতরাই অনেকটা বেশি থাকায় বিনোদন জগতে অ্যাংজাইটি, ডিপ্রেশনের সমস্যাও বেশি দেখা যায়।’

 

তিনি বলেন, ‘অনেকেই অনেক স্বপ্ন দেখেন কিন্তু হাতে গোনা কয়েকজনই খ্যাতি পান। বাকিরা সাফল্য পান না বা লাইম লাইটে পৌঁছানোর আগেই ফিরে আসতে হয়। অথবা নতুন মুখ এলে পুরানোদের জায়গা ছেড়ে দিতে হচ্ছে— এমন উদাহরণও বিস্তর রয়েছে। এটা অনেকেই মেনে নিতে পারেন না।’