ই-পেপার | বুধবার , ১৭ই জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

আগ্রাবাদ কলোনি হাইস্কুল এবং আমি……

কাউসার চৌধুরী :

ঢাকায় ‘আগ্রাবাদবাসী’ নামে একটি সংগঠন আছে। চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ এলাকার মানুষ যারা ঢাকায় বসবাস করেন- মূলত তাদের নিয়েই এই সংগঠন। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি এক অনুষ্ঠানে আমাকে তারা বিশেষভাবে সম্মানিত করেছেন ভালোবাসা দিয়ে, ভালোবাসার অর্ঘ্য দিয়ে। সম্প্রতি আমার একুশে পদক প্রাপ্তিকে কেন্দ্র করেই ভালোবাসা জানিয়েছেন তারা। অনুষ্ঠানটি আয়োজিত হয়েছিল ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের গলফ ক্লাবের একটি মিলনায়তনে। সারাদিনের ওই অনুষ্ঠানে অনেক পেয়েছি, ভালোবাসায় ঋদ্ধ হয়েছি। ’আগ্রাবাদবাসী’র ভালোবাসায় আমি আপ্লুত, অভিভূত। ওঁদের ভালোবাসায় আমি ঋণি।

 

আগ্রাবাদ- আমার জীবনের বড়ো একটি বাঁক বদলের জায়গা। আগ্রাবাদ সরকারি কলোনি হাই স্কুলে পড়বার সময়ে এই ‘বদল’টি হয়! বিষয়টি একটু খুলে বলি।

 

আগেও বেশক’বার বলেছি- আমার গ্রাম মাতারবাড়ির প্রাইমারি স্কুলে আমি ক্লাস ফাইভ অব্দি পড়াশোনা করেছি। এরপরে আমি চকরিয়া হাই স্কুলে ক্লাস সিক্স এবং পেকুয়া হাই স্কুলে ক্লাস সেভেন পর্যন্ত পড়েছি। তারপরেই আমি চট্টগ্রাম শহরের ‘আগ্রাবাদ সরকারি কলোনি হাই স্কুলে’ ভর্তি হই (ক্লাস এইটে, ১৯৬৮ সালে) আমার বড়ো ভাই মোশতাক আহমদ চৌধুরীর সুবাদে। উনি তখোন ওই স্কুলে সহকারি প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। পরে অবশ্য প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি ’৭০ এবং ’৭১-সালে। থাক ওসব!

 

আমার ‘শহরে-প্রবেশ’ নিয়ে কথা বলি একটু।
গ্রামের নিরেট এক আবাল কিশোর আমি! এক ঝটকায় শহরের একটি স্কুলে এসে কিছুটা সংকোচ আর সীমাহীন স্বপ্ন নিয়ে পড়াশোনা শুরু করি নব-উদ্যমে! ক্লাসের বন্ধুদের ঝরঝরে স্মার্টনেস বরাবরই আমাকে অপাংক্তেয় করে রাখতো নিজের কাছে। কিছুটা হীনমন্যতায় যে ভুগিনি তেমনটিও নয় কিন্তু! আর বন্ধুরাও আমাকে একটা গ্রাম্য ‘বোকা …চ’ হিসেবেই ট্রিট করতো সেই সময়ে ! বন্ধুদের সেই দৃষ্টিভঙ্গী আজ এত বছর (৫৬ বছর) পরে এসে কতোখানি পরিবর্তিত হয়েছে, আদৌ হয়েছে কীনা- আমার জানা নেই! অবশ্য আমার ‘বুদ্ধিবৃত্তিক স্তর’ যদি সেই আগের লেভেলেই পড়ে থাকে, তাহলে আমার প্রতি বন্ধুদের দৃষ্টিভঙ্গি ‘উন্নয়নের’ কোন সুযোগ নেইও বটে! তাই সেই আগের ‘বোকা চ…’ হয়েই থাকতে অনেক আরাম বোধ করছি!

 

সে সময়ে ঝরঝরে স্মার্ট বন্ধুদের মধ্যে- সুন্নাহ, আফতাব, মোফাজ্জল, নুরু, শাহ জহির, জীবন, মজনু, ফজলু, খুরশিদ’রা আমাকে দাবড়িয়ে বেড়াতো তাদের ক্ষুরধার বুদ্ধি আর দীপ্তি দিয়ে। এরা ছিল খুব মেধাবী! আমি এদের ‘দীপ্তি’ আর ‘গতি’র জ্যোতিটুকু আবডাল থেকে বিস্ময়ের সাথে দেখতাম আর মনে মনে ভাবতাম- আহা রে, আমিও যদি কোনদিন ওদের মতো……!

তবে সে সময়ে আগ্রাবাদ স্কুলের যে ক’জন বন্ধু আমাকে কিছুটা সহানুভূতি দেখাতো তারা নিজেরাও কিন্তু চট্টগ্রামের বাইরে থেকে এসে, অভিভাবকদের সুবাদে এই স্কুলে পড়াশোনা করার সুযোগ পেয়েছিল! তাদের মধ্যে আজাদ জহির অন্যতম। বলে রাখা ভালো চট্টগ্রাম শহরের নামকরা স্কুলগুলোর মধ্যে ‘কলেজিয়েট স্কুলের’ পরেই ছিল আমাদের ‘আগ্রাবাদ সরকারি কলোনি হাই স্কুলের’ অবস্থান। পড়াশোনা, খেলাধুলা, সংস্কৃতি চর্চা- সব কিছুতেই আমাদের স্কুল ছিল বেশ খানিকটা এগিয়ে।

 

মজার বিষয়, আমি কিন্তু কোনকালেই একেবারে খারাপ ছাত্র ছিলাম না। আবার, ক্লাসে ফার্স্ট হওয়ার মতো যোগ্যতাও আমার ছিল বলে মনে হয়নি কোনদিন! ছাত্র হিসেবে আমি বরাবররই একজন ‘মিডিওকার’- সেই প্রাইমারি স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত।

 

কিন্তু কেন জানি, অজ পাড়া গাঁ-ই বলুন ছাই দ্বীপ অঞ্চলের একজন ‘গাঁইয়া’ই বলুন, আমি কিন্তু পড়াশোনার পাশাপাশি ‘এক্সট্রা কারিকুলাম এক্টিভিটিস’ বলতে যা বোঝায়- ওসবে সব সময় এক নম্বরেই অবস্থান করেছি! সেটা মাতারবাড়ি হোক অথবা চট্টগ্রাম শহরই হোক কিংবা রাজধানীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো ধ্বজাধারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কথাই বলুন; আমি কিন্তু ‘ওসব ক্ষেত্রে’ প্রথম হয়েই থেকেছি আজীবন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতাধিক বছরের ইতিহাসে আজ অব্দি আমিই একমাত্র শিক্ষার্থী- যার পক্ষে ‘ডাকসু সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা’ এবং ‘ডাকসু সাহিত্য প্রতিযোগিতা’- উভয় বিভাগেই সর্বশ্রেষ্ঠ স্থান অর্থাৎ ‘ব্যক্তিগত চ্যাম্পিয়নশীপ’ অর্জন করেছি! নিজের ঢোল নিজেই পেটালাম! গোস্তাকি মাফ করবেন বন্ধুগণ।

 

বলছিলাম আগ্রাবাদ সরকারি কলোনি হাই স্কুলের কথা। ওই স্কুলে ক্লাস এইটে পড়াকালেই ছাত্র রাজনীতিতে আমার হাতেখড়ি হয়ে যায়। ইচড়ে পাকামি বলুন আর যাই-ই বলুন- ওটাই ছিল সেই সময়ের বাস্তবতা। আগ্রাবাদ সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট কলোনিতে এবং ওই কলোনি-স্কুলে ছিল পাকিস্তানি আর বিহারিদের আধিপত্য! মাঝেমধ্যে তারা যেই কদর্য ভাষায় আমাদের সম্বোধন করতো, তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করতো- সেটা ছিল ভীষণ আপত্তিকর এবং আমার পক্ষে একেবারেই অসহনীয়!

 

একদিন বিহারিদের একজন, একটি তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে আমার মা এবং বোনকে কদর্যভাবে গালাগাল করে! ওটা সহ্য করতে না পেরে তাকে প্রচণ্ড জোরে ঘুসি মেরে দেই ওর কপালে! তৎক্ষণাৎ ওই বিহারি তার পকেটে থাকা ‘ফাইভ স্টার ডেগার’ (ছুরি) বার করে আমাকে আঘাত করার চেষ্টা চালায়। আমি বাঁ হাত দিয়ে তার ছুরি ঠেকানোর চেষ্টা করি। কিন্তু এরমাঝেই ছুরির ফলা দিয়ে সে এক টানে আমার হাতের বেশকিছু অংশ কেটে ফেলে। পক্ষান্তরে আমিও কামড়ে ধরি তার বুকের মাংস। এভাবে চলতে থাকে কয়েক সেকেণ্ড! অবশেষে সিনিয়র ক’জন বড়ো ভাইয়ের মধ্যস্থতায় পরষ্পরকে ছেড়ে দেই! কিন্তু আমার বাঁহাতের কব্জিতে সেই বিহারির ছুরির ক্ষত আজো বহন করে চলেছি অসহায়ভাবে! ধ্বিক, ধ্বিক ওদের জন্য।

 

লক্ষ্যনীয়, আমাদের জাতীয় জীবনে ওই সময়টা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যে বছরে আমি আগ্রাবাদ স্কুলে ভর্তি হই, সে বছরের (১৯৬৮) ৩ জানুয়ারি বাংলার অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রধান আসামী করে অন্য ২৮জনসহ সর্বমোট ৩৫ জনকে অভিযুক্ত করে একটি মামলা রুজু করে পাকিস্তানি সরকার। যার শিরোণাম ছিল ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’। বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা শেখ সাহেবকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেবার হীনচক্রান্তে রুজু করা হয়েছিল সেই মামলা!

 

কিন্তু সেই মামলার ফল হয় উল্টো! পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট আইয়ূব খানের সেই হীন ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে তেতুলিয়া থেকে টেকনাফ পর্যন্ত পূর্ব বাংলার মানুষ প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। জ্বলে ওঠে সারা বাংলা। পূর্ব বাংলার আবালবৃদ্ধবণিতা নেমে আসে রাস্তায়। মিছিলে মিটিং-এ শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্ত করার আন্দোলনে যুক্ত হন সবাই। সেই ১৩ বছর বয়সে আমিও সেই মিছিলে যোগ দেই অনেকটা মন্ত্রমুগ্ধের মতো! ১৩ বছর বয়সের একটি কিশোর রাজনীতির কিছুই বুঝবার কথা নয়। আমিও বুঝিনি তেমন কিছুই! কিন্তু এটা স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলাম যে- ওদের (পাকিস্তানিদের) সাথে আমাদের মিলবে না কোনদিন!

 

আজও মনে আছে আমার- উনসত্তরের উত্তাল সেই দিনগুলোতে আমিও মিছিলে-স্লোগানে কন্ঠ মিলিয়েছি- ‘জেলের তালা ভাঙ্গবো, শেখ মুজিবকে আনবো’ বলে। ‘আইয়ূব তোমার কোন আইন মানিনা মানবো না, আইয়ূবকে তো চাইনা, চাইও না’! ‘সংগ্রাম সংগ্রাম চলবেই চলবে’- এসব স্লোগান দিয়েছি গলা ফাটিয়ে!

 

আজ বিস্মিত হই এই ভেবে যে, উনসত্তরের জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি একটা সময়ে ৫/৭দিন আমি জেল খেটেছি পুলিশের সাথে সংঘর্ষ করার কারনে! সেই সময়ে আমাদের একটি মিছিল চট্টগ্রাম নিউ মার্কেটের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল লাল দিঘীর মাঠের দিকে। যাবার পথে, তৎকালীণ স্টেট ব্যাংক ভবন অতিক্রম করার সময় পুলিশের সাথে মিছিলকারীদের সংঘর্ষ বেধে যায়।

 

আমিও ছিলাম সেই মিছিলে। কথায় বলে ‘বাঁশের চাইতে কঞ্চি শক্ত’! বড়োদের ছাড়িয়ে আমার বয়েসী কয়েকজন আমরা অতি-উত্তেজনায় পাকিস্তানি পুলিশের ওপরে ইট পাটকেল নিয়ে চড়াও হই! কিন্তু মিনিট খানেকের মাথায় পুলিশের লাঠির আঘাতে শুয়ে পড়ি রাস্তায়! ওখান থেকে তুলে নিয়ে পুলিশ জেলখানায় পাঠিয়ে দেয় আমাদের। ওখানে ৫/৭দিন থাকার পর ‘অপ্রাপ্ত বয়সের’ কারনে কোর্ট থেকে মুক্তি পেয়ে যাই একদিন। ওসব নিয়ে আগেও একদিন লিখেছি এই ফেসবুকের দেয়ালে।

 

বিষয়গুলো আবারো উল্লেখ করছি আজ! কারন- আমার বর্তমান মানস, দর্শন, লড়াই-সংগ্রামের ভিতটা বোধকরি তৈরি হয়েছিল সেই আগ্রাবাদ স্কুলে অধ্যয়নকালেই। বাঙালি জাতীয়তাবাদের বীজ তখোনই বপন হয়েছিল আমার মগজে, রক্তে-মজ্জ্বায়। ফলে আমার আজকের অবস্থান থেকে আগ্রাবাদ স্কুলকে বাদ দেয়া যাবেনা কিছুতেই।

 

আমার আগ্রাবাদ স্কুলের কাছে আমি ভীষণ কৃতজ্ঞ। কৃতজ্ঞ আমার স্কুলের সেই বন্ধুদের কাছে- যারা ষাটের দশকের সেই স্বাধীকার আন্দোলনের সময় আমাকে তাদের পাশে দাঁড়াবার সুযোগ দিয়েছিল! মিছিলে মিটিং-এ লড়াই-সংগ্রামে হাতে হাত রেখে এগিয়ে যেতে সহযোগিতা করেছিল লড়াই-এর মাঠে।

 

এরপরে এলো মহান মুক্তিযুদ্ধ। ২৫ মার্চ রাত প্রায় দেড়টা কিংবা দুইটার দিকে বঙ্গবন্ধুর ‘স্বাধীনতার ঘোষণা’ আমি নিজ কানে শুনেছি মোঘলটুলিতে। চট্টগ্রামে হোটেল আগ্রাবাদের পেছনে নবী কলোনিতে ছিল আমাদের বাসা। হোটেল আগ্রাবাদ থেকে শ’খানেক গজ দূরের জিন্নাহ রোডে (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু সড়ক) বেবী ট্যাক্সিতে মাইকের হর্ন লাগিয়ে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক সেই ঘোষণা পড়ে শোনানো হচ্ছিল জরুরীভাবে। সেই ঘোষণা শুনে প্রচণ্ড শংকার রাতেও চোখের জল ধরে রাখতে পারিনি- আনন্দে।

 

এপ্রিলের ২ তারিখে মাতারবাড়ির উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম ত্যাগ করি আমি ভোর চারটার দিকে। আরো কয়েকটা পরিবারের সাথে কর্নফুলি নদী পার হয়ে আনোয়ারা হয়ে ছুটেছি মাতারবাড়ির পথে। বাঁশখালি, জলদি, ছনুয়া (যতদূর মনে পড়ে) মগনামা, উজানটিয়া হয়ে চলে যাই মাতারবাড়িতে তিন দিনের মাথায়। আনোয়ারা থেকে মাতারবাড়ি পর্যন্ত সেই প্রাণ বাঁচানোর যাত্রা নিয়ে একাধিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করা যেতে পারে! সেই শরণার্থী-যাত্রা নিয়ে ২০২২ সালে লিখেছিলাম ‘সমকালে’র পাতায়।

 

একদিন বিশ্রাম নিয়ে এপ্রিলের ৭ তারিখে (সম্ভবত) আমিও মাতারবাড়িতে অনুষ্ঠিত ‘মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণে’ অংশ নেই। প্রশিক্ষণ শেষে আমরা মাতারবাড়িকে বেশক’দিন শত্রুমুক্ত রাখতে পেরেছিলাম। কিন্তু মে মাসের ৬ তারিখে পাকিস্তানি বাহিনী মহেশখালি দখন করে আমাদের দ্বীপে মর্টার শেল নিক্ষেপ করতে থাকে সকাল ১১টা কি ১২টার দিকে। শেলের আঘাতে বাড়িঘর ছিদ্র হয়ে গিয়েছিল।

 

মর্টারের আক্রমণে টিকতে না পেরে আবারো চট্টগ্রাম শহরে ফিরে যাই। সেই আগ্রাবাদে। বিজয় অর্জন পর্যন্ত তোহা গাজীর নেতৃত্বে রামগড় এবং চট্টগ্রামের বিভিন্ন জায়গায় মুক্তিযুদ্ধে নানাভাবে অংশগ্রহন করেছি।

 

পৃথিবীতে বহু দেশ আছে, জাতি আছে- যারা স্বাধীনতা পেয়েছে ‘আপোষে’! তাদেরকে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য লড়াই করতে হয়নি, যুদ্ধ করতে হয়নি! যেমন ধরুণ, ভারত পাকিস্তান কিংবা সিঙ্গাপুর মালয়েশিয়ার স্বাধীনতা। উল্লেখিত দেশগুলোতে আপোষে বৃটিশরা তাদের পতাকা নামিয়ে- ভারত পাকিস্তান কিংবা সিঙ্গাপুর মালয়েশিয়ার পতাকাকে স্যালুট করে পাড়ি জমিয়েছে বিলেতে! এতে কোন যুদ্ধ হয়নি, লড়াই হয়নি। রাজনৈতিক কূট-কৌশলের জয়-পরাজয় হয়েছে মাত্র!

 

কিন্তু আমাদের বাংলাদেশ স্বাধীন করতে গিয়ে ২৩ বছর লড়াই সংগ্রাম করতে হয়েছে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে। একাত্তরে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করতে হয়েছে নয় মাস! এই যুদ্ধকালে শহীদ হয়েছে ৩০ লক্ষ বাঙালি। ধর্ষিত হয়েছে ২ লাখ নারী। সন্মুখ যুদ্ধে প্রাণ দিয়েছে অসংখ্য লড়াকু মুক্তিযোদ্ধা। দেশের সাধারণ মানুষকে সাথে নিয়ে, জীবন বাজী রেখে দেশকে শত্রুমুক্ত করেছে মুক্তিযোদ্ধাগণ।

 

এটা ভাবতে বুকটা ফুলে ওঠে- আমিও সেই বীর মুক্তিযোদ্ধাদের একজন। সেই ১৬ বছর বয়সে আমিও এই মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছি; তার পরিমান যত বড়ো কিংবা যত ছোটই হোকনা কেনো! আমিও জীবন বাজী রেখে লড়াই করেছি সহযোদ্ধাদের সাথে। এই সুযোগ পৃথিবীর সব মানুষ পায়নি। পায়নি বাংলাদেশের সব মানুষও!

 

আমি অত্যন্ত ভাগ্যবান! অন্যান্য বীর মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি আমিও- “লিখতে পেরেছি বিশ্বের সেরা মুক্তির ইতিহাস, আর রক্ত আকরে মুক্তির জয়গান……।” এক জীবনে আর কতো চাই! শুধুমাত্র এই একটি কারনে (মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন) আমার জীবনে কোন দুঃখ নেই; বরং আনন্দ আছে। গর্ব আছে, আছে অহংকার।

 

আর এই অহংকার করার ‘পাটাতন’ তৈরি করে দিয়েছিল আমার আগ্রাবাদ সরকারি কলোনি হাই স্কুল; আর আমার স্কুলের সহ-যোদ্ধাগণ। সেই স্কুলের বন্ধু আর ‘আগ্রাবাদবাসী’ আমাকে সেদিন ‘সম্মাননা’ প্রদান করলো প্রাণখুলে। এই সম্মান আমি কোথায় রাখি! কথায় বলে- ‘মাটিতে রাখলে পিঁপড়ায় খায়, আর মাথায় রাখলে খায় উকুনে’! তাই, তাদের এই সম্মাননা আমি রেখে দিলাম বুকের মধ্যিখানে, অনুভূতির গভীরে। মৃত্যুর পরেও আমি মনে রাখবো আগ্রাবাদবাসীর এই ভালোবাসা, সম্মাননার কথা।

 

জয় হোক আমার স্কুলের, জয় হোক ‘আগ্রাবাদবাসী’র।বাঙালির জয় হোক। জয় হোক বাংলাদেশের। চিরজীবী হোক বাংলাদেশ। জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু।

 

লেখক: কাওসার চৌধুরী; একুশে পদকপ্রাপ্ত, কক্সবাজারের কৃতি ব্যক্তিত্ব।